
৪৬ কোটি টাকার প্রকল্পে হালদা নদীর উন্নয়ন কতটুকু?
হালদা নদী বাংলাদেশের এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ নদীপথ — দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক কার্প মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে এটি পরিবেশবিদ, গবেষক এবং স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা পায়। দীর্ঘদিন ধরে মা-মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুমে এখানে ডিম সংগ্রহ ও মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে দেশব্যাপী মাছ শস্য উৎপাদনে অবদান থাকে।
২০২৩ সালে হালদা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গৃহীত হয়, যার লক্ষ্য ছিল জলজ প্রাণী ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নদী ব্যবহার ও আইন বাস্তবায়ন। কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্পের সুফল কোথায়? স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের ঘোষিত উদ্দেশ্য এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বা তা ব্যর্থতার মুখে পড়েছে — এবং তার ফলাফল হিসেবে ডলফিনসহ বড় মাছের মৃত্যু ও প্রকৃত পরিবেশগত চাপ বেড়েই চলেছে।
হালদা নদী আন্তর্জাতিক সংস্থা IUCN অনুসারে গঙ্গা ডলফিন — একটি আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন (endangered) প্রাণী — এর আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত। বিশ্বের প্রায় ১,১০০টি ডলফিনের মধ্যে আনুমানিক ১৭০টি হালদায় পাওয়া যায়, কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেক ডলফিন মারা গেছে বলে পরিবেশ গবেষকরা জানিয়েছেন। জালে আটকে থাকা, পানির দূষণ, খাবারের সংকট ও অপর্যাপ্ত নজরদারি এগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, গবেষণায় দেখা গেছে পূর্বে হালদায় ডলফিন সংখ্যা প্রায় ১৬৭ ছিল, যা বিভিন্ন বছরে কমে-বাড়ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৩৯ ছাড়িয়েছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেহে আঘাত বা জালে ধরা পড়ার মতো চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে — ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্প কি আইন-পরিচালনা, মনিটরিং, পরিবেশগত সুরক্ষা ও বাস্তব কার্যক্রমে সত্যিই যথেষ্ট ভূমিকা নিচ্ছে? স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কর্মসূচি বারবার বদলানো হচ্ছে এবং প্রকৃত বাস্তবায়ন না থাকায় হালদায় অবৈধ জাল, বিষ এবং অরক্ষিত মাছ শিকার অব্যাহত রয়েছে।

এখানেই প্রকৃত সংকটের মূল পয়েন্ট — প্রকল্পে শুধু ব্যয় বা পরিকল্পনার নাম করে রাখা নয়, বাস্তবে জলজ পরিবেশের তদারকি, নিয়মিত মনিটরিং, স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণ ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রকল্প কেবল কাগজে থাকবে; আর হালদা নদীর প্রাকৃতিক সহায়তা, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক মূল্য হারিয়ে যাবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে প্রকৃত তথ্য-ভিত্তিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, স্থানীয়দের সঙ্গে ব্যাপক সমন্বয়, এবং দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া — যাতে মা-মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুম সুরক্ষিত হয়, এবং ডলফিনসহ অন্যান্য প্রাণী নিরাপদ পরিবেশে বাঁচতে পারে। নয়তো হালদার মতো অনন্য নদী সংরক্ষণ প্রকল্প সভ্যতার আয়োজনে ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে যাবে।