
কৃষিজমি হ্রাস ও মাটিকাটা নষ্ট করছে হাটহাজারীকে
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা—একসময় যার পরিচয় ছিল ফসলের মাঠ আর কৃষকের ঘামে ভেজা জমি—আজ সেখানে দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে দ্রুত। অনাবাদী জমির বিস্তার, মাটি কাটা, ইটভাটার আগ্রাসন এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ন মিলিয়ে কৃষির জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তবু এই পরিবর্তনের মাঝেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই জমিগুলো কি আবার ফিরে পেতে পারে তাদের হারানো উর্বরতা?

ফাইল ছবি
সকালের আলোয় যেসব জমিতে একসময় লাঙ্গলের রেখা দেখা যেত, সেখানে এখন ট্রাকের চাকা। উর্বর টপসয়েল কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নির্মাণকাজে, ভরাটে কিংবা ইটভাটায়। জমির বুক চিরে নেওয়া এই মাটি শুধু বর্তমানকে নয়, ভবিষ্যৎ কৃষিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কারণ একবার উপরের উর্বর স্তর হারালে সেই জমিকে ফিরিয়ে আনতে বছরের পর বছর লেগে যায়, কখনো কখনো আর সম্ভবই হয় না।

নগরায়নের ঢেউ এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করেছে। কৃষিজমি এখন আর কেবল খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। প্লটিং, আবাসন, সড়ক—সবকিছু মিলিয়ে জমির ব্যবহার বদলে যাচ্ছে। কৃষকও এই বাস্তবতার বাইরে নন। তিনি দেখছেন, একদিকে অনিশ্চিত কৃষি, অন্যদিকে জমি বিক্রি বা লিজ দিয়ে নিশ্চিত আয়। ফলে জমি পড়ে থাকছে, কিন্তু চাষে ফিরছে না।
তবে এই সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। হাটহাজারীতে কৃষি পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জমিকে আবার কৃষির আওতায় ফিরিয়ে আনার একটি সুসংহত পরিকল্পনা। স্থানীয় কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে অনেকেই আবার চাষে ফিরতে পারেন। একই সঙ্গে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি—উচ্চফলনশীল বীজ, যান্ত্রিক চাষাবাদ, বহুমুখী ফসল চাষ—এই এলাকাকে আবার উৎপাদনমুখী করে তুলতে পারে।
খাল-বিল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সচল রাখা, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা—এসব উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ, যদিও অনেকের মতে এটি এখন একমাত্র প্রধান সমস্যা নয়। বরং জমির ব্যবহার যাতে কৃষির বাইরে চলে না যায়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
এই জায়গাতেই সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে মাটি কাটা ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কৃষিজমির টপসয়েল কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ইটভাটা ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে, জরিমানা করেছে, অনেক ভাটা বন্ধও করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অভিযানগুলো প্রায়ই সাময়িক হয়ে থাকে। টেকসই ফল পেতে হলে নিয়মিত মনিটরিং, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

হাটহাজারীর কৃষির ভবিষ্যৎ এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে কৃষি—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে অনাবাদী জমির সংখ্যা আরও বাড়বে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এখনো এই পরিবর্তনের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা জমির নয়, দৃষ্টিভঙ্গির—এই মাটিকে আমরা শুধু নির্মাণের উপকরণ হিসেবে দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যের উৎস হিসেবে রক্ষা করব।